Bangladesh India Sundarban Region Cooperation Initiative
বাংলাদেশ ভারত সুন্দরবন
যৌথ উদ্যোগ
Tuesday, August 4, 2020
1 মে 2019

জলবায়ু পরিবর্তন সুন্দরবনের ‘দ্রুততম বাড়া বিপদ ’

পোল্যান্ডের কাটোভিসায় অনুষ্ঠিত গত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ঠিক আগে একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা থেকে দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রী বাড়লেই সুন্দরবনের মত উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলি সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে ভয়ঙ্কর বন্যার প্রকোপে পড়বে।সুন্দরবন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমিগুলির একটি এবং “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” যা ভারতের পশিমবঙ্গ রাজ্য এবং বাংলাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। রিপোর্টটি আরও জানাচ্ছে যে যদি গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রী বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে থাকা বিস্তৃত বাদাবনের ওপর নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্র ও যে এক কোটি ত্রিশ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন, তাদেরও সর্বনাশ ডেকে আনবে। বস্তুত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থা অনুমান করছে যে বিশ্বের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রী বা তার বেশীও বৃদ্ধি পেতে পারে যদি না উন্নত দেশগুলি অবিলম্বে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন অঞ্চলের বিপদ বেশি কারণ এই অঞ্চলের সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির গতি বিশ্বব্যাপী গড়ের তুলনায় দ্বিগুনেরও বেশি।

বর্তমানে” সুন্দরবনে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির হার ৮ মিলিমিটার বা অধিক; যা গোটা বিশ্বের গড়েরদ্বিগুনেরও তুলনায় বেশি। এর ফলে ইতিমধ্যেই প্রচুর ভূমিক্ষয় হচ্ছে। যদি জলস্তর আরো বাড়ে তবে পরিস্থিতি বিপর্যস্থ হয়ে পড়বে” বক্তব্য কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওসেনোগ্রাফিক স্টাডিজ এর অধ্যাপক সুগত হাজরার। “সুন্দরবন ঐতিহাসিক ভাবে নানা আবহাওয়াজনিত ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে; তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে”, জানালেন লন্ডন স্থিত বাংলাদেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সালিমুল হক যিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যুক্ত। সাম্প্রতিক রিপোর্ট , যেটি প্রায় তিনহাজার বিজ্ঞানীদের দ্বারা তৈরি ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ’ তৈরি করেছে, তার আগে আরেকটি আন্তর্জাতিক রিপোর্ট – আই.ইউ.সি.এন (IUCN) এর ওয়াল্ড হেরিটেজ আউটলুক– II, ২০১৭ – জানিয়েছিল যে জলবায়ু পরিবর্তন সুন্দরবনের বনাঞ্চল সংরক্ষনের ক্ষেত্রে দ্রুততম বাড়া বিপদ। এই বনাঞ্চল ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এবং রয়াল বেঙ্গল টাইগার এর চারণভূমি। আই.ইউ.সি.এন (IUCN) রিপোর্ট এও জানাচ্ছে যে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তনের তাত্ক্ষনিক এবং দীর্ঘমেয়াদী ; দু ধরনের বিপদেই পড়তে পারে। সমুদ্রের তল বৃদ্ধি ও ফলত জলের চক্র পরিবর্তন এবং উপকূলবর্তী ভাঙ্গন ভয়ঙ্কর চেহারা নিতে পারে, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী বিপন্নতা গভীর চিন্তার কারণ হতে চলেছে।

ভবিষ্যতবাণী গুরুতর

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবেশ দফতরের তৈরি ‘জলবায়ু অ্যাকশন প্ল্যান’ য়েও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের কথা বলা হয়েছে । রাজ্য সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী “পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি, সংবেদনশীল এবং মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার অপ্রতুলতার জন্য আরো বেশী বিপদগ্রস্ত” । এই রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের যাবতীয় লক্ষণ এখানে ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান এবং পূর্বাভাস রয়েছে যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে । ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) এর মহম্মদ শামসুদ্দিন এবং অন্যান্য দের তৈরি একটি গবেষণাপত্রে – ক্লাইমেট চেঞ্জ ইমপ্যাক্টস অন সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সার্ভিস এন্ড ডিপেনডেন্ট লাইভলিহুডস ইন বাংলাদেশ – দেখানো হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০০১ সালের তুলনায় ২১০০ সালে বাংলাদেশ সুন্দরবনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে ও তার ফলে সুন্দরী এবং গেওয়ার মত সুন্দরবনের মূল বাদাবন প্রজাতিগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। গবেষনাপত্রে দেখা গেছে যে এর ফলে মাছ চাষ, পর্যটন, জীববৈচিত্র্য-র মতো বাস্তুতন্ত্র নির্ভর বিষয়গুলি প্রভাবিত হতে পারে।

শুধু সুন্দরবনই নয়, আই.ইউ.সি.এন এর সমীক্ষায় ২৪১ টি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের ক্ষেত্রে “দ্রুততম বাড়া বিপদ” হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকেই চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬২ টি স্থান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বেশী বা খুব বেশি বিপন্ন। ২০১৪ সালের সমীক্ষায় ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বেশী বা খুব বেশি বিপন্ন’, এমন ৩৫ টি জায়গা ছিল ; অর্থাত কয়েক বছরে এমন অঞ্চল ৭৭ শতাংশ বেড়েছে।”এটিই এখন বৃহত্তম সম্ভাব্য বিপদ” স্পষ্ট জানাচ্ছে রিপোর্টটি। আই.ইউ.সি.এন রিপোর্টটি এও জানাচ্ছে যে “এই সমস্যা সামলাতে বর্তমানে ক্ষমতা ও অর্থ দুই কম আছে এবং এই বিষয়গুলিকে অবিলম্বে খেয়াল না করলে জলবায়ু পরিবর্তন সামলাতে অদূর ভবিষ্যতে লড়াই আরো কঠিন হবে; বিশেষ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ক্রমেই জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনাকে মাথায় রাখলে”।

যৌথ প্রচেষ্টা জরুরী

এটি দুই সুন্দরবনের পক্ষেই একটা বড় সুযোগ যৌথভাবে কাজ করে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতাকে কমিয়ে আনার, বিশেষ করে উন্নততর আডাপটেসন বা মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে”, বললেন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অনুরাগ দন্ড। এ বিষয়ে সালিমুল হোক এটাও মনে করান যে দুদেশের উচিত সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে একযোগে কাজ করা এবং এই সংকটের সমাধান খুজে বের করা। বস্তুত IUCN’র রিপোর্টটিও ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে থাকা পূর্ণাঙ্গ সুন্দরবনকে বাঁচাতে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে দু – দেশকে কাজ করার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিল।

সুন্দরবনের বনাঞ্চল : এক ঝলকে

সুন্দরবনে মোট বনভূমি – ১০২৬০ বর্গ কিমি
সুন্দরবন বন (ভারত) – ৪২৬০ বর্গ কিমি (২৩০০ বর্গ কিমি সংরক্ষিত বন)
সুন্দরবন বন (বাংলাদেশ) – ৬০০০ বর্গ কিমি (১৩৮৭ বর্গ কিমি সংরক্ষিত বন)

Leave a Reply