Bangladesh India Sundarban Region Cooperation Initiative
বাংলাদেশ ভারত সুন্দরবন
যৌথ উদ্যোগ
Sunday, July 12, 2020
1 মে 2019

বালি; বাঘের মুলুকের গায়ের দ্বীপ

ভারতীয় সুন্দরবনে গোসাবা ব্লকের ৯টি দ্বীপের মধ্যে একটি হল বালি।মূল ভূখন্ড থেকে প্রায় এক ঘন্টা নদীপথ দুরত্বে অবস্থিত দ্বীপটি দাঁড়িয়ে আছে এমন এক অবস্থানে যা বাঘের বাসস্থানের একেবারেই গায়ে বললে ভুল বলা হয়না; মাঝখানে তফাত করেছে মাত্র একটি মাঝারি মাপের নদী। বস্তুত আগে কয়েকবার নদী সাঁতরে বালি দ্বীপে বাঘ ঢোকার ঘটনা ঘটেছে।তবে এখন পশ্চিমবঙ্গের বন বিভাগ বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যাতে বাঘ সহজে গ্রামে ঢুকতে না পারে Iদ্বীপটি বিদ্যা ও গোমতী নদীর পলিতে নির্মিত। বিদ্যা নদী দ্বীপের পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত আর গোসাবা বাজার থেকে সোনাগাও পর্যন্ত জায়গাটি পূর্ব দিকে দুর্গাদুয়ানি ও গোমতী নদীগুলির মধ্যে রয়েছে।দক্ষিণ দিকে বিদ্যা মিশেছে পঞ্চমুখিনী নদীতে; উত্তরে পড়ছে বিদ্যা-দুর্গাদোয়ানি ও হোগোল নদীর সঙ্গম। অতীতে দ্বীপের জমিতে চাষের সময় বালিয়াড়ি দেখা যেত, যার ফলে এই দ্বীপের নাম ‘বালি’ হয়।

জমিদারি ব্যবস্থার পাশাপাশি ১৭৭০ সাল থেকে সুন্দরবনে চাষাবাদ শুরু হয়। জমিদারদের প্রতিনিধিরা, যারা কিনা ব্রিটিশদের কাছ থেকে জমি পেয়েছিলেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপগুলিতে ৪০-৫০ বছরের ভাড়া চুক্তিতে চাষ শুরু করেন। ১৯১২ সাল নাগাদ বালি দ্বীপে চাষের কাজ শুরু হয়। এই সময়ে বেলিয়াঘাটা, নদিয়া, কলকাতা, বর্ধমান, ঢাকুরিয়া, মগরাহাট ইত্যাদি জায়গা থেকে জমিদাররা এই দ্বীপে জমি ব্যবস্থাপনা ও চাষের জন্য আসেন। এই চাষাবাদের কাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ বালিতে এসেছিল যেমন বিহারের আদিবাসীরা; মেদিনীপুর,বারুইপুর এবং ডায়মন্ড হারবার থেকে বেদে, ভুমিজ ইত্যাদিরা। পরবর্তীকালে, এই মানুষগুলির একটা বড় অংশ দ্বীপে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে যা আরো পরে ছয় মৌজাতে বিভক্ত হয়ে যায়; বীরজানগর-জেএল নং -১৬, ১৭, বালি জেএল নং -১৮, আমলামেথী জেএল -১৯, চরআমলামেথী জেএল নং -২০ এবং মথুরখন্ড জেএল নং-২১ । তবে ১৯৭৮ সালে দ্বীপটি দুটি গ্রাম-পঞ্চায়েত, বালি ১ এবং বালি ২ তে বিভক্ত হয়েছিল। বালি ১ গ্রাম পঞ্চায়েতে তিনটি মৌজা – আমলামেথী, চর আমলামেথী ও মথুরখন্ড – এবংবালি ২ গ্রাম পঞ্চায়েত বীরজানগর, বিজয়নগর ও বালি মৌজা নিয়ে গঠিত হয়েছে।
এই দ্বীপটির চারপাশে ৪৬ কিমি নদী বাঁধ, এর মধ্যে ২২ কিলোমিটার বালি ১ এবং ২৪ কিলোমিটার নদী বাঁধ বালি ২ তে অবস্থিত, যা বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃদ্ধির সময়ে দ্বীপটির টিকে থাকার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাচক্রে ১৯৮৮ ও ২০০৯ সালের ভয়ংকর ঝড় এখনও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে জীবিত; যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সুন্দরবনে উল্লেখযোগ্য জীবন ও জীবিকাহানি হয়। সাম্প্রতিক কালে অবশ্য বালি দ্বীপের ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে, একটি পর্যটন গন্তব্য হিসাবে এই দ্বীপের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের দৈনিক চাহিদা মেটাতে আমলামেথী, রাজাবাজার, মথুরখন্ড মন্দির বাজার, বালি বুধবার বাজার, বিজয়নগর বিদ্যামন্দির স্থানীয় বাজার আছে। চারটি ডাকঘর দৈনিক ডাকের প্রয়োজন মেটায়। শিশুদের শিক্ষার জন্যে বালিতে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে; যেমন বালি ধনমনি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়; সতুরনারায়নপুর শশীভূষণ উচ্চ বিদ্যালয় বা বিজয়নগর আদর্শ বিদ্যামন্দির।
কৃষি চাহিদা পূরণের জন্য, বিভিন্ন খালে; যেমন হলি খাল, মালসওয়ঙ্গী খাল, কালী খাল, ছারকাখার খালে; বৃষ্টির জলসংরক্ষণ করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে দ্বীপের ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষি, মাছ ও কাঁকড়া ধরা, মাছ ও চিংড়ির পোনা সংগ্রহ, বন থেকে মধু সংগ্রহ, নৌকা তৈরির জীবিকায় রয়েছেন ও সামান্য কিছু মানুষ চাকরি ও ব্যবসার সাথে জড়িত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি ও মৎস্যজীবীদের জীবিকার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে; ফলে এইসব ক্ষেত্র থেকে পর্যটন ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজকর্মে যোগদানের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কিভাবে যাবেন বালি :

কলকাতা থেকে
গাড়িতে: বারুইপুর, ক্যানিং, সোনাখালী হয়ে গদখালী পর্যন্ত আনুমানিক ৮৫ কিমি রাস্তা যেতে প্রায় ২.৫ ঘন্টা সময় লাগবে; গদখালী থেকে লঞ্চে ১ ঘন্টা লাগবে বালি দ্বীপে পৌঁছতে।
স্থানীয় ট্রেন: শিয়ালদাহ থেকে ক্যানিং পর্যন্ত যেতে স্থানীয় ট্রেনে ১.৩০ ঘন্টা লাগবে, ক্যানিং থেকে গদখালী পৌঁছানোর জন্য অটোরিকশা বা ভাড়া গাড়ি প্রায় ১ থেকে ১.৩০ ঘন্টা সময় নেয়। সেখান থেকে লঞ্চে বালি দ্বীপে।
বাসে: কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে গদখালী পৌঁছাতে পারেন, যা প্রায় 4 ঘণ্টা সময় নিতে পারে। সেখান থেকে লঞ্চে বালি দ্বীপে।

Leave a Reply