Bangladesh India Sundarban Region Cooperation Initiative
বাংলাদেশ ভারত সুন্দরবন
যৌথ উদ্যোগ
Tuesday, August 4, 2020
1 মে 2019

লবণাক্ততা নারী, শিশুদের সমস্যা বাড়াচ্ছে

সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় অতি লবণাক্ততা নারী ও শিশুদের, বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের, গুরুতর স্বাস্থ্যের সমস্যা সৃষ্টি করছে।

লবণাক্ত জলের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে গাছপালাতো নষ্ট হচ্ছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য খাবারও; যেমন মাছ, মুরগি, ইত্যাদিও; নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর জন্য পুষ্টির অভাবকেই মূলত দায়ী করছেন।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার গাবুরা গ্রামের ১৯ বছর বয়সী গর্ভবতী আয়েশা বেগম, বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত।”আমি গর্ভবতী হওয়ার পরে সবসময় খুব ক্লান্ত এবং দুর্বল বোধ করি। কখনও কখনও এমনকি আমি সঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারিনা। সারা গায়ে ভয়ংকর চুলকানির কারণে রাতে আমি ঘুমাতে পারি না”, আয়েশা ডেইলি অবজারভারকে বললেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে পুষ্টির অভাব বিভিন্ন ধরণের রোগ সৃষ্টি করে। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ম: নজরুল ইসলাম বলেন, আয়শা রক্তাল্পতা এবং গর্ভাবস্থায় উচ্চরক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভুগছেন।

“এই ধরনের প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা খুব চিন্তাজনক। রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাবের কারণে হয় এবং যার প্রভাবে প্রসবকালীন অনেকরকম সমস্যা দেখা দেয়” জানালেন তিনি। রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করে এবং শিশুদের মধ্যে রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

“আমরা উদ্বিগ্ন যে ভাবে এ ধরনের রোগের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে; আমরা আগে এমন প্রবণতা লক্ষ্য করিনি। মনে হয় পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবই এই রোগের পিছনে মূল কারণ । ”

ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামের মানুষগুলি ডায়রিয়া, আমাশা, কাশি, ঠান্ডা লাগা, চর্ম রোগ, চোখের সংক্রমণ, ব্যথা, পক্ষাঘাত, জন্ডিস, জল বাহিত রোগ, টাইফয়েড, অ্যানিমিয়া, উচ্চ রক্তচাপ এবং গুরুতর মাথাব্যথা সহ নানা রোগে ভুগছে; জানালেন ডঃ ইসলাম।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের অভাবে নারী ও শিশুরা কিছু মারাত্মক রোগের পাশাপাশি এমন কিছু রোগ, যা বছরের বিশেষ কিছু সময়ে হয়, তাতেও ভুগছে।

দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মহম্মদ মোজাম্মেল হক নিজামি জানালেন যে গত কয়েক বছরে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ জনিত কারণে শরীরে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতি হয়েছে, এমন রোগীদের ভর্তির হার বেড়েছে।

হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, রক্তচাপে ভোগরোগীদের সংখ্যা ২০১২ সালে ১৫৯ ছিল।  কিন্তু ২০১৫ সালে এটি ১৯৬ তে পৌঁছেছিল।

উপরন্তু, লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজ এবং ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ দ্বারা পানীয় জলের লবণাক্ততা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে সাধারণ অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা বেশি ছিল। একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে উপকূলীয় বাংলাদেশে শুকনো আবহাওয়ার সময় এই ধরনের রোগ বেশী হচ্ছে।

একই এলাকার ৭১ বছর বয়সী সোনা বানু উল্লেখ করেছিলেন যে চিংড়ি চাষের ভেড়িতে নোনা জল দীর্ঘ সময় ধরে রাখার জন্যে তা চাষের জমিতে চলে যাচ্ছে।

সোনা বানু তিন দশক আগের দিনগুলো স্মরণ করে বলেন, “আমার বাবা-মা এমনকি বাপ-দাদারাও এই ধরনের রোগ সম্পর্কে শোনেনি । এখন আমাদের মেয়েরা এবং শিশুরা এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন”। “প্রত্যেক পরিবারে আগে কমপক্ষে কিছু মরসুমী ফলের গাছ যেমন পেয়ারা, আম, নারকেল ইত্যাদি থাকত I পুকুর, খাল ও নদীগুলিতে স্থানীয় মাছ পাওয়া যেত ।এখন একটিও গাছ দেখা যায়না,” তিনি বললেন।

খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার মুলাপাড়া গ্রামে বসবাসরত সীতারা বানু (৬৭), সোনা বানুর মতোই বললেন, “বিশেষ করে মাছই ছিল গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টির মূল উৎস।গর্ভবতী মায়েদেরকে কিছু বিশেষ মাছ খেতে তখন পরামর্শ দেওয়া হতো”।

“আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী গর্ভবতী মায়েদের খির আর নতুন চালের ভাত খেতে দেওয়া হতো; সেই সঙ্গে পুকুর আর নদীর মাছ, যা তখন প্রচুর ছিল” তিনি বলেন।

সিতারা, শ্যামনগর জেনারেল হাসপাতালের স্থানীয় ডাক্তার, উল্লেখ করলেন যে গত কয়েক বছরে গর্ভস্রাব এবং গর্ভপাতের হার উভয়ই বেড়েছে।

দাকোপ উপজেলার অন্য বাসিন্দা ডেইলি অবজারভারের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, “আগে প্রতিটি গ্রামেই প্রচুর পুষ্টিকর সবজি যেমন লাল শাক, কলমি শাক, পালং, কুমড়া, লাউ, শাপলা ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে হতো যা দরিদ্র মানুষের পুষ্টির যোগান দিত”। এছাড়াও অনেক ঔষধি গাছও হত যা সদ্য আক্রান্ত হওয়া মায়ের ও তার শিশু সন্তানের পুষ্টির যোগানের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও দিত; বললেন ডাক্তার।  মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা মনে করেন পুষ্টির অভাবের পেছনে মূল কারণ লবণাক্ততা। চিংড়ি উৎপাদনের কারণে উপকূলীয় জেলাগুলিতে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে, ঘন ঘন নোনা জলের বাঁধ টপকে প্রবেশ এবং নদীতে যথেষ্ট পরিমানে মিষ্টি জলের যোগান কমে যাবার জন্যে সাধারণ ফসল উৎপাদনও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

“আগে স্থানীয় কৃষকরা অনেক পুরনো প্রজাতির ধান চাষ করতেন, যেমন বরণ; চুর্কুন; ঢাক শাল, পাটনাই ও গাভি ; যা এখন স্রেফ অতীতের গল্প। চিংড়ি চাষের ফলে এই ধরনের ধান চাষ নষ্ট হয়ে গেছে,” পরিবেশকর্মী পাভেল পার্থ বললেন । তিনি প্রতিকূল প্রভাব প্রতিরোধ করার জন্য খাবারের পুরনো উত্সগুলিতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

২০০৭ সালে সিডর এবং ২০০৯ সালে আইলা দুটো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের পর সমস্যাটি তীব্রতর হয় বলে বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানান। তিনি মন্তব্য করেন যে নোনা জলের অনুপ্রবেশ এবং ঘূর্ণিঝড়গুলির ফলে প্রচুর গবাদি পশু, ছাগল ও অন্যান্য পোল্ট্রিতে থাকা প্রাণী মারা যায় ও তার ফলে খাবারে প্রোটিন কম পরে। এই ধরনের সমস্যা সামলাতে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কিনা জিজ্ঞাসা করলে মন্ত্রী জানান যে প্রথমে তারা প্রচুর গাছ লাগাচ্ছেন ও লবনাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন প্রজাতির ধান সেচন করছেন।

এই প্রতিবেদনটি বনানী মল্লিক লিখেছেন, যা প্রথমে বাংলাদেশের ডেইলি অবজার্ভার, পত্রিকায় প্রকাশ পায়

Leave a Reply